আয়ারল্যান্ডে আশ্রয় আবেদন বাড়ছে, আলোচনায় বাংলাদেশীরাও
অর্থনৈতিক অভিবাসন নাকি প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থী? কীভাবে কাজ করে আয়ারল্যান্ডের এ্যাসাইলাম ব্যবস্থা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাজ্যের Northern Ireland হয়ে Belfast রুট ব্যবহার করে আয়ারল্যান্ডে প্রবেশের পর আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বা asylum (International Protection) আবেদন করার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে বিভিন্ন বাংলা (বাংলাদেশী) Facebook গ্রুপে এ বিষয়ে বাংলাদেশীদের ব্যাপক আলোচনা ও পরামর্শ চাওয়ার ঘটনা চোখে পড়ছে। অনেক বাংলাদেশী জানতে চাইছেন, দীর্ঘদিন অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে অবস্থানের পর আয়ারল্যান্ডে এসে asylum আবেদন করলে বৈধ হওয়ার সুযোগ আছে কি না। আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, যুক্তরাজ্যে পূর্বে asylum আবেদন করা থাকলেও আয়ারল্যান্ডে এসে নতুন করে আবেদন করা সম্ভব কি না এবং আইরিশ ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তা জানতে পারবে কি না।
ইমিগ্রেশন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের একটি অংশ অর্থনৈতিক কারণে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছে এবং এদের অনেকে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। তবে প্রকৃত যুদ্ধ, নির্যাতন বা রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের জন্যই asylum ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। শুধুমাত্র কর্মসংস্থান, আর্থিক সমস্যা বা উন্নত জীবনের আশায় আবেদন করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
কীভাবে আসছেন অনেকে?
বাংলাদেশী কমিউনিটির বিভিন্ন সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্যে care worker visa নিয়ে যাওয়া কিছু ব্যক্তি পরবর্তীতে সমস্যায় পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, কিছু recruitment agency বা sponsor company চাকরির প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে কাজ দিতে পারেনি কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এরপর অনেকে যুক্তরাজ্যে অনিশ্চিত অবস্থায় পড়ে গিয়ে Belfast হয়ে Republic of Ireland এ প্রবেশ করে asylum আবেদন করছেন। একই রুট ব্যবহার করছেন পাকিস্তান, নাইজেরিয়া, ভারত, জর্জিয়া ও অন্যান্য দেশের নাগরিকদের একটি অংশও। আইরিশ বিচারমন্ত্রী Jim O’Callaghan সম্প্রতি জানিয়েছেন, আয়ারল্যান্ডে নতুন আন্তর্জাতিক সুরক্ষা আবেদনকারীদের একটি বড় অংশ Northern Ireland হয়ে প্রবেশ করছে। কিছু রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রায় ৮০ থেকে ৮৮ শতাংশ নতুন আবেদনকারী এই রুট ব্যবহার করেছে বলে সরকারের ধারণা।
আয়ারল্যান্ডে asylum বা International Protection কী?
আয়ারল্যান্ডে asylum এখন “International Protection ” নামে পরিচালিত হয়। এর আওতায় মূলত তিন ধরনের সুরক্ষা দেওয়া হতে পারেঃ Refugee Status, Subsidiary Protection, Permission to Remain.
যদি কেউ নিজ দেশে রাজনৈতিক নিপীড়ন, যুদ্ধ, ধর্মীয় নির্যাতন, জাতিগত সহিংসতা বা জীবনঝুঁকির কারণে ফিরতে না পারেন, তাহলে তিনি আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদন করতে পারেন।
আবেদন প্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করে?
আয়ারল্যান্ডে প্রবেশের পর আবেদনকারীকে International Protection Office (IPO) এ নিবন্ধন করতে হয়। এরপরঃ 1) প্রাথমিক সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় 2) বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা হয় 3) পূর্বে অন্য দেশে asylum আবেদন ছিল কি না তা যাচাই করা হয় 4) বিস্তারিত সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হয় 5) পরে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় অনেক ক্ষেত্রে EURODAC নামের ইউরোপীয় biometric database ব্যবহার করে আবেদনকারীর পূর্ববর্তী asylum record শনাক্ত করা সম্ভব হয়। ফলে যুক্তরাজ্য বা অন্য ইউরোপীয় দেশে পূর্বে আবেদন করা থাকলে তা গোপন রাখা কঠিন হতে পারে বলে আইনজীবীরা সতর্ক করেছেন।
Approval rate কত?
European Council on Refugees and Exiles (ECRE) এর ২০২৪ আপডেট অনুযায়ী, আয়ারল্যান্ডে ২০২৪ সালে প্রায় ১৮,৫৬০টি আন্তর্জাতিক সুরক্ষা আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ আবেদন কোনো না কোনো ধরনের সুরক্ষা পেয়েছে।
তবে বিভিন্ন জাতীয়তার ক্ষেত্রে approval rate ভিন্ন হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত বা রাজনৈতিক অস্থির দেশের আবেদনকারীরা তুলনামূলক বেশি সাফল্য পেলেও অর্থনৈতিক কারণে আসা আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানের হার অনেক বেশি। আরও কিছু আন্তর্জাতিক ডেটা অনুযায়ী, প্রথম ধাপেই বিপুল সংখ্যক আবেদন বাতিল হয়ে যায়।
বাংলাদেশীদের অবস্থান কী?
আয়ারল্যান্ডে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ থেকেও asylum আবেদন বেড়েছে বলে বিভিন্ন ইউরোপীয় পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। Eurostat এর তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপজুড়ে বাংলাদেশী asylum applications উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।তবে ইমিগ্রেশন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র আর্থিক দুরবস্থা, চাকরির অভাব বা উন্নত জীবনের আশায় asylum আবেদন করলে সেটি আন্তর্জাতিক সুরক্ষার মানদণ্ড পূরণ করে না।
আবেদন বাতিল হলে কী হয়?
যদি আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়, তাহলে আবেদনকারী International Protection Appeals Tribunal (IPAT) এ আপিল করতে পারেন। আপিলেও ব্যর্থ হলে অনেক ক্ষেত্রে deportation order জারি হতে পারে। আইরিশ সরকারের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, শত শত ব্যক্তি deportation order পাওয়ার পরও IPAS accommodation এ অবস্থান করছেন। দ্বিতীয় বা subsequent আবেদন করতে হলে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করতে হয়। একই তথ্য পুনরায় দিলে সাধারণত আবেদন গ্রহণ করা হয় না।
IPAS accommodation কী? আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য আয়ারল্যান্ডে IPAS (International Protection Accommodation Services) নামে আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে হাজার হাজার আবেদনকারী এই ব্যবস্থার আওতায় বিভিন্ন হোটেল, সেন্টার ও accommodation facility তে অবস্থান করছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে IPAS accommodation এ প্রায় ৩৩ হাজার মানুষ অবস্থান করছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়ছে আলোচনাঃ
সাম্প্রতিক সময়ে Facebook এর বিভিন্ন বাংলা (বাংলাদেশী) গ্রুপে যুক্তরাজ্য থেকে আয়ারল্যান্ডে এসে asylum করার উপায়, আবেদন করলে বৈধ হওয়া যাবে কি না, UK asylum history আয়ারল্যান্ড জানতে পারবে কি না, এমন নানা প্রশ্ন করতে দেখা যাচ্ছে। ইমিগ্রেশন পরামর্শকরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অসম্পূর্ণ বা ভুল তথ্যের ওপর নির্ভর না করে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অনুমোদিত solicitor বা qualified immigration adviser এর সঙ্গে কথা বলা উচিত।
সরকার কঠোর অবস্থানেঃ
আয়ারল্যান্ড সরকার বর্তমানে asylum processing দ্রুত করার পাশাপাশি অবৈধ প্রবেশ ও সিস্টেমের অপব্যবহার ঠেকাতে নতুন আইন ও কড়াকড়ির দিকে এগোচ্ছে। বিচারমন্ত্রী Jim O’Callaghan জানিয়েছেন, asylum process ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।